বিশেষায়িত ব্যাংক কাকে বলে, কয়টি ও বিশেষায়িত ব্যাংকের কাজ কি

সহজ কথায় বিশেষ কোন খাতের উন্নয়নের জন্য যে ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয় তাকে বিশেষায়িত ব্যাংক বলে। জানুন বিশেষায়িত ব্যাংক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য।

যে ব্যাংক অর্থনীতির বিশেষ কোনো দিকের উন্নয়ন ও প্রসারের লক্ষ্যে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে, তাকে Specialized Bank বা বিশেষায়িত ব্যাংক বলে।

বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো কোন দেশের সরকার কর্তৃক একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়। যেমন- কৃষি বা শিল্প উন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কৃষি ব্যাংক।

দুটি বিশেষায়িত ব্যাংকের নাম বলতে হলে বলা যায়, কৃষি ব্যাংক এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক।

বিশেষায়িত ব্যাংকের কাজ কি

একটি বিশেষায়িত ব্যাংক নিম্মোক্ত কাজগুলো করে থাকে।

  • বিশেষায়িত ব্যাংক তার পরিচালনার জন্য একটি স্থির পরিকল্পনা গ্রহণ, মান নির্ধারণ এবং আর্থিক নীতি প্রণয়ন করে।
  • ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বা ক্লায়েন্টদের ঋণ প্রদান, পুঁজি গঠন, তারল্য নীতি প্রণয়ন এবং ভবিষ্যত লক্ষ্য নির্ধারণ করে থাকে।
  • আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দ্বায়িত্বশীল থাকা
  • হিসাব ধারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর নগদ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করা
  • প্রবিধান অনুযায়ী, হিসাবধারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে বেতন-ভাতা ও পারিশ্রমিক তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ করা, ইত্যাদি।

বাংলাদেশের বিশেষায়িত ব্যাংক কয়টি ও কি কি

বর্তমানে বাংলাদেশে ৩টি বিশেষায়িত ব্যাংক (Specialized Bank) রয়েছে। বিশেষায়িত ব্যাংকগুলো হলো,

  1. বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক
  2. রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক
  3. প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক

বিশেষায়িত ব্যাংক কত প্রকার

বিভিন্ন ধরণের বিশেষায়িত ব্যাংক হতে পারে। বিভিন্ন দেশে বর্তমানে যে ধরণের বিশেষায়িত ব্যাংক (Specialized Bank) দেখা যায় এগুলো নিচে ধরণ অনুযায়ী ব্যাখ্যা করা হলো।

১. কৃষি ব্যাংক (Agricultural bank)

দেশের কৃষিখাতের উন্নয়নের জন্য কৃষকদের অর্থসংস্থানের জন্য প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকগুলো এক ধরণের বিশেষায়িত ব্যাংক। এই ব্যাংকগুলোকে কৃষি ব্যাংক বলা যেতে পারে।

এ ব্যাংকগুলো মূলত কৃষকদের কৃষি যন্ত্রপাতি, সার, বীজ ইত্যাদি ক্রয়ে প্রয়োজনীয় মূলধনের জন্য ঋণ সহায়তা দেয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক এ ধরণের ব্যাংকের উদাহরণ হতে পারে।

২. শিল্প ব্যাংক (Industrial bank)

শিল্প ব্যাংকগুলোও এক ধরণের বিশেষায়িত ব্যাংক। একটি দেশের দেশের শিল্পখাতের উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত ব্যাংককে শিল্প ব্যাংক বলে।

শিল্প ব্যাংকগুলো শিল্প উদ্যোক্তাদের স্বল্পমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী ঋণ প্রদান করে থাকে। বাংলাদেশ উন্নয়ন ব্যাংক লিমিটেড (Bangladesh Development Bank Limited) বাংলাদেশে এ ধরনের ব্যাংকের উদাহরণ।

৩. প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক

কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে যাওয়া কর্মীদের ঋন প্রদাণ করার জন্যই মূলত এ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়।

বাংলাদেশ সরকার ২০১০ সালে অভিবাসীদের ঋণ সহায়তা প্রদানের জন্য প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে।

৪. কর্মসংস্থান ব্যাংক (Employment bank)

দেশের বেকার যুবকদের বিভিন্ন উদ্যোগে ঋণ সহায়তা করার জন্য যে বিশেষ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয় তা কর্মসংস্থান ব্যাংক।

এ ব্যাংগুলোর মূল উদ্দেশ্য, দেশের বেকারত্ব দূর ও দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে বেকার ও আত্মকর্মসংস্থানমূলক উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা। কর্মসংস্থান ব্যাংক’ বাংলাদেশে এ ধরনের একটা বিশেষায়িত ব্যাংক।

৫. সঞ্চয় ব্যাংক (Savings or Deposit bank):

জনগণের নিকট পড়ে থাকা সঞ্চয়গুলোকে আমানত হিসেবে সংগ্রহ করে মূলধন গঠনের লক্ষ্যে যে ব্যাংক কাজ করে তাকে সঞ্চয় বা আমানত ব্যাংক বলে।

জনগণকে সঞ্চয়ে উৎসাহিত করে পুঁজি গঠন করাই এ ব্যাংকের মূল কাজ। বাংলাদেশে ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক এ উদ্দেশ্যেই গঠিত একটি ব্যাংক।

৬. বিনিয়োগ ব্যাংক (Investment bank)

দেশের ব্যবসায় বাণিজ্যের প্রসারে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সরবরাহের জন্য যে বিশেষায়িত ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয় তাকে বিনিয়োগ ব্যাংক বলে। এ ব্যাংক ঋণ সরবরাহ ছাড়াও নতুন কোম্পানি বা শিল্প প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতার উদ্দেশ্যে অবলেখক ও দায়গ্রাহকের ভূমিকা পালন করে।

এ জন্য শেয়ার বিক্রয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পাশাপাশি প্রয়োজনে নিজেও প্রচুর শেয়ার ক্রয় করতে পারে।ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (ICB) একটি বিনিয়োগ ব্যাংক।

৭. বিনিময় ব্যাংক (Exchange bank)

বৈদেশিক ব্যবসায়ে অর্থসংস্থান এবং বৈদেশিক মূদ্রা বিনিময় ও লেনদেনে সহায়তা করার জন্য বিনিয়ম ব্যাংক প্রতিষ্ঠা হয়। এসব ব্যাংক মূলত আমদানি-রপ্তানি ব্যাবসায়ে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানকে ঋণ প্রদান, প্রত্যয়ন ইস্যু, বৈদেশিক দেনা পাওনার নিষ্পত্তি করে থাকে।

৮. সমবায় ব্যাংক (Co-operative bank)

সমবায় আইনের আওতায় গঠিত ও পরিচালিত যে ব্যাংক সমিতির সদস্যদের অর্থনৈতিক কল্যাণের জন্য সদস্যদের কাছ থেকে সঞ্চয় গ্রহণ করে মূলধন গঠন ও তাদেরকে স্বল্পসূদে ‍ঋণ প্রদান করে থাকে।

সমবায় ব্যাংকগুলোর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে, সদস্যদের আর্থিক কল্যাণ ও উন্নতি। বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক লিঃ এ ধরণের ব্যাংকের উদাহরণ হতে পারে।

৯, মার্চেন্ট ব্যাংক (Merchant bank)

বিনিময় ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ ব্যাংকিং কার্যক্রমের জন্য গড়ে ওঠা ব্যাংকগুলো মার্চেন্ট ব্যাংক। এ ধরণের ব্যাংকগুলো উপরে বর্ণিত এক্সচেঞ্জ ব্যাংক ও ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের কার্যক্রম একইসাথে করে থাকে।

১০. আমদানি-রপ্তানি ব্যাংক (Import-export bank):

বৈদেশিক বাণিজ্যে প্রয়োজনীয় অর্থসংস্থান ও সহায়তার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত বিশেষায়িত ব্যাংককে আমদানি-রপ্তানি ব্যাংক বলে। এই ব্যাংক আমদানি ও রপ্তানিধর্মী প্রতিষ্ঠানে ঋণদান, বৈদেশিক বাণিজ্যে প্রত্যয়পত্র ইস্যু, বৈদেশিক বিনিময় বিলে স্বীকৃতি প্রদান এবং লেনদেন নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করে। আমাদের দেশে কার্যত এ ধরনের ব্যাংক নেই তবে বাণিজ্যিক ব্যাংকসমূহ অনেকাংশে এ দায়িত পালন করে।

১১. ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ব্যাংক (Small and cottage industries bank)

একটি দেশের ক্ষুদ্র শিল্পগুলোকে ঋণ, পরামর্শ প্রদানের জন্য গঠিত ব্যাংকগুলোকে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ব্যাংক বলা যায়। এ ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্র শিল্পের মূল্যায়ন, প্রোফাইল তৈরি, ঋণ প্রদান ও পরামর্শ প্রদান করে থাকে।

এ ধরণের ব্যাংকের উদাহরণ হতে পারে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ব্যাংক (BASIC)।

১২. গৃহসংস্থান ব্যাংক (Housing bank)

আমরা দেখি শহর অঞ্চলে আবাসন সমস্যা প্রকট থাকে। দেশের জনসাধারণের আবাসন সমস্যা দূর করার বিশেষ উদ্দেশ্যে গৃহসংস্থান ব্যাংক গঠন করা হয়।

এ ধরণের ব্যাংকগুলো, বাড়ি নির্মাণ, সংস্কার, ফ্ল্যাট ক্রয় ইত্যাদি খাতে এ ধরনের ব্যাংক দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রদান করে এবং মাসিক কিস্তিতে উক্ত অর্থ আদায় করে থাকে। বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (HBFC) এ ধরনের একটা প্রতিষ্ঠান।

১৩. ভোক্তা ব্যাংক (Consumer bank)

সাধারণ ভোক্তাদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী ক্রয়ে সাহায্য করার জন্য গঠিত বিশেষায়িত ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানকে ভোক্তা ব্যাংক বলে। এ ধরণের ব্যাংকগুলো ভোক্তার ক্রয় সুবিধার্থে ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করে।

এ ছাড়া এরূপ ব্যাংক বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য; যেমন – ফ্রিজ, টিভি, গাড়ি ইত্যাদি সামগ্রী কিস্তির ভিত্তিতে সরবরাহ করে।

১৪. পরিবহন ব্যাংক (Transportation bank)

দেশের পরিবহন খাতের প্রসারের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানকে ঋণ সরবরাহ করার জন্য প্রতিষ্ঠা করা হয় পরিবহন ব্যাংক।

এ ব্যাংক প্রধানত যানবাহন নির্মাণ, আমদানি, ক্রয়, মেরামত, খুচরা যন্ত্রপাতি ক্রয়ের জন্য ঋণ প্রদান করে থাকে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এ ধরনের বিশেষায়িত ব্যাংক নেই।

FAQs

রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক কত সালে প্রতিষ্ঠিত হয়?

রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ১৫ মার্চ ১৯৮৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।

বিশেষায়িত ব্যাংকিং কি?

যে ব্যাংক অর্থনীতির বিশেষ কোনো খাত নিয়ে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করে, তাকে স্পেশালাইজড ব্যাংক বা বিশেষায়িত বাংক বলে। যেমন কৃষি ব্যাংক, শিল্প ব্যাংক ইত্যাদি।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।